আযহার সালতানাতের যত অধিপতি

লিখেছেন— জিএম রাব্বানী চৌধুরী

শতাব্দীর চক্রাকার ঘূর্ণয়ন এখনো অবিরত। ইতিহাসের কতশত খোরাক জোগানো হয়েছে! কত মনিষীর জীবনী-শক্তি রোপন করা হয়েছে! কত রাজা মাহারাজাকে আপন গৌরবে ধন্য করা হয়েছে, কত জ্ঞান-সন্ন্যাসীর ইলমি পিপাসা নিবারণ করা হয়েছে! হাজার বছর ধরে শুধু দেয়াই হচ্ছে,  অথচ সামান্যটুকু আবেদনও এখন অবধি কমেনি। যেভাবে চলছে, উত্তরোত্তর খ্যাতি আর সুনামে যে নিজেকে ছাড়ানোই এখন কেবল লক্ষ্য; তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। জামেয়াতুল আযহার। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ তকমা পেয়েছে– এখনো চলমান পৃথিবীর ২য় প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের। ফাতেমি সম্রাট মুইজ লিদিনিল্লাহর আদেশে, সেনাপতি জাওহার সিকিল্লির তত্ত্বাবধানে ৩৬১হিজরিতে যার প্রারম্ভিকতা। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত শিয়াই ইলমের মারকায হয়ে টিকে থাকা শুধু তার বস্তুতান্ত্রিক জৌলুসই নয়; এশিয়া আফ্রিকা রুটে বিদ্যমান বিশাল জনগোষ্ঠীর জ্ঞান তপস্যার অন্যতম দলিলও বটে। এরপর রাজনৈতিক পরিবর্তনে আগমন মহাবীর সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবীর। মতাদর্শে শাফেয়ি সুন্নি ছিলেন বিধায় বুঝতে পেরেছিলেন, ইসমাইলি শিয়াদের এই কেন্দ্র গোটা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানসাধকদের কম ক্ষতি চালায়নি। এখনই বন্ধ না করলে অনেক দেরী হয়ে যাবে। ভারী কন্ঠে আদেশ দিলেন– বুদ্ধিবৃত্তিতে দ্বীনের নামে বদদ্বীনি এখনই বন্ধ করতে হবে। 

ফলত ১০০ বছরের বিরতি। খুরাফাত চর্চা থেকে নিজেকে বাচানোর যথাযথ সুযোগ গ্রহণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন আত্মপরিচয় গড়ে তোলা।

যে জ্ঞানজোয়ার ভিত্তিদূর্বল আকিদাকে শক্তিশালী করছে, তার উদ্যম জোয়ারকে গোড়া থেকে বাধা না দিয়ে ভালোর দিকে পর্যবসিত করা ছিলো অধিক যৌক্তিক। পরবর্তী শাসকগোষ্ঠীর প্রচেষ্টায় ব্যপারটি ফুটে উঠেছিলো। সালাউদ্দিন আইয়ুবির আদেশে দীর্ঘ ১০০ বছর বন্ধ থাকার পর যখন সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স মিশরের অধিপতি হন, এক শতাব্দী ধরে বন্ধ থাকা জামে আযহারে ততদিনে ইসমাইলিদের কোন চিহ্ন আর বাকি নেই। তাতার আর ক্রুসেডের ত্রাস সুলতান বাইবার্স যুদ্ধে যেমন কৌসুলি ছিলেন, উম্মাহর কল্যাণে দূরদর্শীও ছিলেন। জামে আযহারকে নতুন করে সাজালেন। পুরো আফ্রিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বের একটি ইলমি মারকাযের প্রয়োজন তিনি খুব করে অনুভব করেছিলেন। তাই অবকাঠামো নির্মাণ শেষে দ্রুতই ইলমি হালকা চালু করেন। পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে ছাত্র এবং শিক্ষকদের জন্য ভাতার ব্যবস্থাও করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত শত বাধাবিপত্তি পাশ কাটিয়ে আযহার চলছে আপন গতিতে। ইলমের নিশান উড়িয়ে।

১০৯০ হিজরি মোতাবেক ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে উসমানিদের আমলে আযহারের প্রশাসনিক উন্নতির লক্ষ্যে অফিশিয়ালি শায়খুল আযহার পদের সূচনা করা হয়। সেই থেকে তিনশত পঞ্চাশ বছরে এখন পর্যন্ত ৪২ জন শায়খ এই দায়িত্ব পালন করেছেন। মোহাম্মদ আলি পাশার আগ পর্যন্ত আযহারের কিবার উলামাগণই কেবল শায়খুল আযহার নির্ধারণে ভূমিকা রাখতেন। পরবর্তীতে সরকারী হস্তক্ষেপও এতে অনুপ্রবেশ করে; এর অন্যতম কারণ ছিলো আযহারি শায়খদের রাজনৈতিক সচেতনতা। রাষ্ট্রকে ইসলামি ধারায় টিকিয়ে রাখতে তাঁরা সরকার পরিচালনায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। স্বভাবতই আযহারের শায়খ নির্ধারণেও এর প্রভাব পড়ে। 

লেখার আলোচ্যবিষয় হিসেবে এবার আমরা সংক্ষেপে শায়খুল আযহারদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো। বিশেষ করে তাদের ইলমি অবস্থান, আযহারের উন্নতিতে তাঁদের অনস্বীকার্য অবদান উল্লেখ না করলেই নয়। 

 

১. মুহাম্মদ আল খুরাশি মালেকি

সময়কাল: ১০৯০-১১০১ হি./১৬৭৯-১৬৯০ খ্রি.

জন্ম ১৬০১ খ্রিস্টাব্দে। শায়খুল আযহার নির্ধারিত হবার আগে তিনি জামে আযহার ছাড়াও বিভিন্ন মাদরাসায় দরস দিয়েছিলেন; ফলে তাঁর ছাত্রসংখ্যা অগণিত। তাঁর ছাত্রদের মধ্য থেকে পরবর্তীতে অনেকেই শায়খুল আযহার হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ফিকহ, উসুলে ফিকহ, উসুলে হাদিস, মানতিক সহ লুগাহর বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর ৭টি কিতাব পাওয়া যায়। গরীব-দুঃখীদের উন্নতির স্বার্থে আমির সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁর সহাবস্থান বেশ প্রসিদ্ধ ছিলো। 

২. ইব্রাহিম বারমাউয়ি শাফেয়ি

সময়কাল: ১১০১-১১০৬ হি./ ১৬৯০-১৬৯৫ খ্রি.

মিশরের পশ্চিমাঞ্চলে তাঁর জন্ম। জামে আযহারে ইসলামের প্রধান চার স্কুল অব থটের অন্যতম ফিকহে শাফেয়ি পড়িয়েছেন দীর্ঘদিন। ফিকহ, তাসাউফ, আকিদা নিয়ে তাঁর প্রায় ৬টি গ্রন্থ এখনো বিদ্যমান আছে। তিনি গরিব-মিসকিনদের সহায়তায় লোকমুখে পরিচিত ছিলেন।

৩. মুহাম্মদ নশরতি মালেকি

সময়কাল: ১১০৬-১১২০ হি./ ১৬৯৪-১৭০৯ খ্রি.

৪. আব্দুল বাকি আল কলিনি

সময়কাল: ১১২০হি./১৭০৯-১১২০হি./১৭০৯.

তিনি মালেকি মাযহাবের আলেম ছিলেন। তৎকালীন বড় সব মাশায়িখ এবং গভর্নরের ঐকমত্যে তিনি শায়খুল আযহারের মসনদে সমাসীন হন।

৫. মুহাম্মাদ শুনান মালেকি

সময়কাল: ১১২০- ১১৩৩ হি./ ১৭০৯- ১৭৩৩ খ্রি.

তিনি সমকালীন বড় ধনীদের অন্যতম ছিলেন। কিন্তু দুনিয়ার প্রাচুর্য তাঁকে ইলম অন্বেষা থেকে দূরে রাখতে পারেনি। সুলতান তৃতীয় আহমদ তার আহবানে সাড়া দিলে আযহার মসজিদের অবকাঠামোগত বেশ কিছু উন্নয়ন সাধিত হয়।

৬. ইব্রাহিম আল ফাইয়ুমি মালেকি

সময়কাল: ১১৩৩- ১১৩৭ হি./১৭২০-১৭২৪ খ্রি.

হাদিস বিষয়ে তাঁর অন্যতম উস্তাদ ছিলেন শায়খ বারমাউয়ি। তিনি উলুমে হাদিস এবং উলুমুল লুগায় পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। প্রতিদিন শতশত ছাত্র তাঁর কাছে দূরদূরান্ত হতে ছুটে আসতো।

৭. আব্দুল্লাহ আশ শাবরাউয়ী শাফেয়ি

সময়কাল: ১১৩৭- ১১৭১ হি./ ১৭২৪- ১৭৫৮ খ্রি.

জীবনের ৮ বসন্ত না পেরুতেই আযহার মসজিদের দরসে নিয়মিত উপস্থিত হতে শুরু করেন। কায়রোবাসি হওয়ায় আযহার থেকে ইলম হাসিলের সর্বোচ্চ সুযোগ নিতে পেরেছিলেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে শায়খুল আযহার পদবিতে ভূষিত হন। জামে আযহারের আধুনিকায়নে তাঁর অগ্রগামী ভূমিকা ছিলো। আযহারে আধুনিক সমাজ বিজ্ঞান, গণিত শাস্ত্রের অনুপ্রবেশ তাঁর হাত ধরেই হয়। এছাড়াও বুদ্ধির ব্যবহার হয় এমন বিভিন্ন শাস্ত্র তিনি আযহারের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি অনেক বড় কবি ছিলেন। একধিক দিওয়ানের রচয়িতা। বিশেরও অধিক কিতাব, বিভিন্ন প্রাচিন কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। আকিদা এবং আরবি ভাষাবিদ হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। গভর্ণর, আমির-উমারাদের সাথে তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। তিনি শায়খুল ইসলাম পদবী লাভ করেছিলেন।

৮. মুহাম্মাদ আল হাফানি শাফেয়ি।

সময়কাল: ১১৭১-১১৮১ হি./ ১৭৫৭-১৭৬৭ খ্রি.

তিনি ইলমে নাহু, ফিকহ, উসুলে ফিকহ এবং উলুমল হাদিসে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। এসব বিষয়ে তিনি বিভিন্ন প্রাচিন তুরাসি কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রস্তুত করেছিলেন। তার রচনা সংখ্যা পনেরোর বেশী। এছাড়াও ফুসহা এবং আমিয়া আরবিতে সাবলীল ভাবে গদ্য এবং পদ্য রচনা করতে পারদর্শী ছিলেন। ফতোয়া প্রদান সহ আদালতের বিচারক প্যানেলের অন্যতম সদস্যও ছিলেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিলেন বলে বিভিন্ন কিতাবের অনুলিপি তৈরি করে দিতেন; এতদসত্ত্বেও রাষ্ট্রের কোন আমির উমারা থেকে হাদিয়া গ্রহণ করতেননা।

৯. আব্দুর রউফ আস সাজিনি শাফেয়ি

সময়কাল: ১১৮১-১১৮৩ হি./১৭৬৭-১৭৬৯ খ্রি.

তিনি ইলমে বাবা এবং চাচাদের মতই বিখ্যাত ছিলেন। আবুল জুদ বা মহান দানবীর উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। শায়খুল আযহার হওয়ার পরও তিনি নিয়মিত দরস করাতেন।

১০. আহমদ দিমিনহাওরি শাফেয়ি

সময়কাল: ১১৮৩-১১৯২ হি./ ১৭৬৯-১৭৭৮ খ্রি.

তিনি একই সাথে যু্ক্তিবিদ, আইনবিদ, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির সহ ইলমে আকাইদ, ফালসাফা এবং বালাগাতে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। সবাই তাঁর ছাত্রত্বের সুযোগ পেতোনা বলে সাধারণের মুখে কৃপণ জ্ঞানী উপাধি পেয়েছিলেন; কিন্তু লেখনীতে তাঁর উল্টো চিত্র আমরা দেখতে পাই। কঠিন সব বিষয়ে তিনি চল্লিশেরও বেশী কিতাব রচনা করেছেন। তিনি চার মাযহাবের ফকিহ ছিলেন, সব মাজহাবের লোকেরাই ফতোয়ার জন্য তাঁর দ্বারস্থ হতেন। ইসলামী বিষয় ছাড়াও তিনি কেমিস্ট্রি, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, জীববিদ্যা, গণিত এবং ভূগোল সহ অসংখ্য শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন। আমির আলি বেক তাঁকে এতোই সমীহ করতেন যে, রাষ্ট্রীয় বিষয়ে পরামর্শ নেয়ার পাশাপাশি তাঁর দরসেও অংশগ্রহণ করতেন।

১১. আহমদ আল আরুসি শাফেয়ি

সময়কাল: ১১৯৩- ১২০৮ হি./ ১৭৭৮-১৭৯৩ খ্রি.

তিনি বালাগাত এবং তাসাউফে বড় আলেম ছিলেন। সমকালীন উলামা, আমির- উমারা এবং জনসাধারণের কাছে ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় পাত্র। তিনি মুস্তফা আল বকরি সুফি ঘরানার শায়খ ছিলেন। এছাড়াও ছিলেন শাফেয়ি মাযহাবের যুগ শ্রেষ্ঠ ফকিহ এবং রাজনীতিবিদ। রাষ্ট্রীয়ভাবে আব্দুর রহমান আরিশিকে শায়খুল আযহার নির্ধারণ করা হলে লোকেরা বিদ্রোহ করে। উলামা এবং জনসাধারণের আগ্রহে পরবর্তীতে আহমদ আল আরুসিকে আযহারের মসনদে সমাসীন হতে হয়। তিনি সৎসাহসী এবং বুদ্ধিজীবী হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে তাঁর এতোটাই প্রভাব ছিলো যে, মিশরে ভিনদেশি সেনাঘাটি নিয়ে তিনি বিরোধ করেন। তাঁর সময়ে মিশর অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়। পণ্যের দামও বেড়ে যায়। তাঁর পরামর্শেই পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিক চাহিদা সম্বলিত পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয় এবং বাজার তদারকিতে লোক নিয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত এই সংকট কেটে যায়।

১২. আব্দুল্লাহ শারকাউয়ি শাফেয়ি

সময়কাল: ১২০৮-১২২৭ হি./১৭৯৩-১৮১২ খ্রি.

তিনি লুগাহ, ফিকহ, উসুলে ফিকহ, তাসাউফ এবং আকিদা বিষয়ক পন্ডিত ছিলেন। এসব বিষয়ে তাঁর ১৪টি রচনা পাওয়া যায়। তিনি বিখ্যাত সব আলেমের উস্তাদ ছিলেন। তাঁর সময়ে মিশরে ফরাসি আক্রমণ হয়। সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহনের পাশাপাশি তিনি যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। সুনামের সাথে শায়খুল আযহারের মসনদ অলংকৃত করেন। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর জন্মদিবস পালন করতে একটি ফরমান জারি করা হয়।

১৩. মুহাম্মদ আশ শানাওয়ানি

সময়কাল: ১২২৭- ১২৩৩ হি./১৮১২-১৮১৭ খ্রি.

উলুমুল হাদিস বিষয়ক তাঁর বেশ কিছু কাজ আছে। এছাড়াও উলুমুল লুগায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। দর্শন এবং গণিত পছন্দ করতেন। তিনি ফারাসি আক্রমণ প্রতিরোধেও স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

১৪. মুহাম্মাদ আল আরুসি শাফেয়ি

সময়কাল: ১২৩৩-১২৪৫ হি./ ১৮১৮-১৮২৯ খ্রি.

তিনি একাদশতম শায়খুল আযহার আহমদ আল আরুসির সন্তান। মুস্তালাহুল হাদিস বিষয়ক একটি কিতাব রচনা করেছিলেন। আগে থেকেই ত্রয়োদশতম শায়খুল আযহার শানাওয়ানির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুর পর কোন প্রশ্ন ছাড়াই সবার ঐকমত্যে শায়খুল আযহারের পদ অলংকৃত করেন। তাঁর সময়ে আহলে কিতাবের জবাইকৃত পশু ভক্ষন নিয়ে একটি ফিতনা দেখা দেয়, তিনি শক্ত অবস্থান নিলে তা নিমিষেই দমে যায়।

১৫. আহমাদ দামাহুজি শাফেয়ি

সময়কাল: ছয় মাস।

১৬. হাসান আল আত্তার শাফেয়ি

সময়কাল: ১২৪৬-১২৫০হি./১৮৩০-১৮৩৪ খ্রি.

তাঁর পিতা আতর ব্যবসায়ী ছিলেন বলে তাঁকে আত্তার বলে ডাকা হত। উলুমুল লুগা, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা সহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রায় ত্রিশের মত কিতাব রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত ছাত্র হলেন মুহাম্মাদ ইয়াদ তনতাবি এবং রিফা তহতবি। তিনি বিভিন্ন উপলক্ষ্যে দেশ বিদেশ সফর করেছিলেন। এজন্য শায়খুল আযহার হবার পর আযহারের মানহাজে আধুনিক বেশকিছু শাস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটান তিনি। ইসলামি বিভিন্ন শাস্ত্র আধুনিকতার মিশেলে সংস্কারকরণেও তাঁর প্রচেষ্টা ছিলো। তিনি ইতিহাস, জিওগ্রাফি নিয়ে নিয়মিত দরস দিতেন।

১৭. হাসান আল কুয়াইসিনি শাফেয়ি

সময়কাল: ১২৫০-১২৫৪ হি./ ১৮৩৪-১৮৩৮ খ্রি.

তিনি দৃষ্টি শক্তিহীন ছিলেন। এরপরও ফিকহ এবং মানতিকের উপর কিতাব লিখেছিলেন। পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছেন এমন বেশকিছু শায়েখ তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছিলেন। তিনি সুফিসাধক এবং দুনিয়া ত্যাগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত শায়খুল আযহার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১৮. আহমাদ সাফাতি শাফেয়ি

সময়কাল: ১২৫৪-১২৬৩ হি./ ১২৩৮-১২৪৭ খ্রি.

আযহার মসজিদে তাঁর দরস তৎকালীন সবচেয়ে বড় দরস বলে গণ্য হত। তিনি লেখালেখির চাইতে দরসকে প্রাধান্য দিতেন; এজন্য তাঁর উল্লেখযোগ্য কোন লিখনি পাওয়া যায়না।

১৯. ইব্রাহিম আল বাজুরি শাফেয়ি

সময়কাল: ১২৬৩-১২৮১ হি./ ১৮৪৭-১৮৬৪ খ্রি.

লুগাহ, ফিকহ, উলুমুল হাদিস, আকাইদ, বালাগাহ সহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর রচনা চল্লিশেরও বেশি। তিনি বিখ্যাত সব উস্তাদের কাছ থেকে ইলম হাসিল করেছিলেন। অসংখ্য বড় আলেম তাঁর হাত ধরেই বেড়ে উঠেছিলো। তাঁর সময়কালের শেষ দিকে আযহারে বেশ কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়; কিন্তু তাঁর চরিত্রে আমির সাইদ পাশা এতোই প্রভাবিত ছিলেন যে, বয়স বাড়া সত্ত্বেও তাঁকে শায়খুল আযহারের পদবিতে বিদ্যমান রাখেন। এবং আযহারে অফিশিয়াল কাজ পরিচালনায় শায়খ মুস্তফা আল আরুসির নেতৃত্বে চারজন উকিল নির্বাচন করে দেন।

২০. মুস্তফা আল আরুসি শাফেয়ি

সময়কাল: ১২৮১-১২৮৭ হি./ ১৮৬৪-১৮৭০ খ্রি.

ইতিপূর্বে তাঁর দাদা এবং পিতা যথাক্রমে ১১তম এবং ১৪তম শায়খ হিসেবে আযহারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই নেতৃত্ব গুণ তিনি ছোটবেলা থেকেই লালন করতেন। ইলমি অঙ্গনেও তাঁর অসামান্য অবদান ছিলো। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ৬টি কিতাব পাওয়া যায়। আযহারে উস্তাদ বাছাইয়ের আধুনিক সিস্টেম তাঁর হাতেই শুরু হয়; এজন্য বেশকিছু নতুন নীতি নির্ধারণ করেন তিনি। এসময়ে শিক্ষক নির্ণয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থাও চালু করেন তিনি। গাম্ভীর্যপুর্ণ ছিলেন বলে ছাত্র থেকে শুরু করে শায়খ-মাশায়িখ, এমনকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমিরগণও তাঁকে সমীহ করে চলতো। পরবর্তীতে কোন কারণ দর্শানো ছাড়াই রাষ্ট্রপ্রধান ইসমাইল খদবির হস্তক্ষেপে পদচ্যুত হন।

২১. মুহাম্মদ আল মাহদি আব্বাসি হানাফি

সময়কাল: ১২৮৭-১২৯৯ হি./ ১৮৭০-১৮৮১ খ্রি. (প্রথম দফা)

তিনি প্রথম কোন হানাফি শায়খুল আযহার। একই সাথে দারুল ইফতা এবং আযহারকে নেতৃত্ব দেয়া প্রথম ব্যক্তিও তিনি। তাঁর আগে একসাথে দুই পদের প্রধান কেউ হতে পারেনি। ফিকহে হানাফি এবং ফতোয়ার কিতাব সহ তিনটি গ্রন্থের রচয়িতা। এছাড়াও তিনি আযহারের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক দিক গুলো নতুন করে সাজান। আজহার সম্পৃক্ত সবার জন্য মাসিক এবং বাৎসরিক ভাতার ব্যবস্থাও করেন তিনি। একাধিকবার রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়েছেন; পরবর্তীতে নিজে প্রতিশোধের সুযোগ পেলেও দয়া প্রদর্শন করে মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন।

২২. শামসুদ্দিন আল ইমবাবি শাফেয়ি

সময়কাল: ১২৯৯-১২৯৯ হি./ ১৮৮১-১৮৮২ খ্রি. (প্রথম দফা)

তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় পঞ্চাশের অধিক কিতাব রচনা করেছিলেন। তাঁর বেশকিছু ছাত্র পরবর্তীতে শায়খুল আযহার হতে পেরেছিলো। উরাবি বিপ্লবের সময় তাঁকে শায়খুল আযহার মনোনয়ন করা হয়।

২৩. মুহাম্মদ আল মাহদি আব্বাসি হানাফি

সময়কাল: ১২৯৯-১৩০৪ হি./ ১৮৮২-১৮৮৬ খ্রি.(দ্বিতীয় দফা)

তাওফিক খদবির নতুন এক ফরমান জারির মাধ্যমে তাঁকে দ্বিতীয়বারের মত শায়খুল আযহার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সহ গোপনে ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরোধিতা করায় সরকার তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। আগেই বুঝতে পেরে তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেন।

২৪. শামসুদ্দিন আল ইমবাবি শাফেয়ি

সময়কাল: ১৩০৪-১৩১২ হি./১৮৮৬-১৮৯৫ খ্রি.(দ্বিতীয় দফা)

একটি ফরমান জারির মাধ্যমে তাঁকে ২য় বারের মত শায়খুল আযহার নির্ধারণ করা হয়। এই মেয়াদে তিনি বেশকিছু রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত হন। প্যারালাইসিস আক্রান্ত হয়ে পড়লে সহায়ক হিসেবে শায়খ হাসুনা নওয়াউয়িকে নিয়োগ করা হয়। সুস্থ না হওয়ায় পরে অবসর গ্রহণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর একাধিক বসতবাড়ি, বিশাল লাইব্রেরি আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দেন।

২৫. হাসুনা নওয়াউয়ি হানাফি

সময়কাল: ১৩১৩-১৩১৭ হি./ ১৮৯৫-১৮৯৯ খ্রি. (প্রথম দফা)

তিনি দ্বিতীয় হানাফি শায়খুল আযহার। শায়খ ইমবাবির সময়কাল থেকেই ওয়াকিলুল আযহার ছিলেন। পরে অবধারিতভাবেই শায়খুল আযহার হন। মাজলিসু শুরা কমিটির অপরিবর্তনযোগ্য স্থায়ী সদস্য ছিলেন। এছাড়াও ছিলেন প্রধান মুফতি। ২৮৭টি ফতোয়া তাঁর নেতৃত্বে বের হয়। ইসলামি আইন বিষয়ে তাঁর দুই খন্ডের একটি কিতাবও রয়েছে। আপিল বোর্ডে দুজন কাজি নিয়োগ দেয়া সংক্রান্ত ঝামেলাকে কেন্দ্র করে তিনি পদস্খলিত হন।

২৬. আব্দুর রহমান কুতুব নওয়াউয়ি হানাফি

সময়কাল: ১৩১৭-১৩১৭ হি./ ১৮৯৯-১৮৯৯ খ্রি.

তিনি তৃতীয় হানাফি শায়খুল আযহার। ২৫তম শায়খ ইমাম হাসুনার ভাতিজা। শুরু থেকেই বিভিন্ন জেলাভিত্তিক আদালতের প্রধান বিচারক ছিলেন। পরবর্তীতে কায়রোর আদালতও সামলেছেন। শায়খুল আযহার হবার পর একমাসের মাথায় ইন্তেকাল করেন। প্রশাসনিক ব্যস্ততা থাকায় লিখিত কোন কিতাব রেখে যেতে পারেননি।

২৭. সালিম আল বাশারি মালেকি।

সময়কাল: ১৩১৭-১৩২০ হি./১৮৯৯-১৯০৩ খ্রি.

তিনি দীর্ঘ ৯ বছর আযহারে পড়াশোনা করেন। তিনি হাদিস শাস্ত্রে বড় পন্ডিত ছিলেন। তাঁর বংশধরদের অনেকেই পরে আযহারের বিভিন্ন বিভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শায়খুল আযহার নির্ধারণ করা হলে তিনি দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। পরে সবার অনুরোধ ও চাপে পড়ে নিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে আযহারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান ২য় আব্বাস হিলমির সাথে অনৈক্যের কারণে অবসর গ্রহণ করেন। হাদিস, আকিদা, ফিকহ, লুগাহ সহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ৮টি গ্রন্থ পাওয়া যায়।

২৮. আলি বাবলাউয়ি মালেকি

সময়কাল: ১৩২০-১৩২৩ হি./ ১৯০৩-১৯০৫ খ্রি.

তিনি হাদিস, উলুমুল কুরআন এবং বরকতময় রাতগুলো (শবে কদর, শবে বরাত) নিয়ে বেশ কিছু কিতাব রচনা করেন। মৃত্যুর আগেই দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেন।

২৯. আব্দুর রহমান শারবিনি শাফেয়ি

সময়কাল: ১৩২৩-১৩২৪ হি./ ১৯০৫-১৯০৭ খ্রি.

ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, মানতিক এবং বালাগাতের উপর তাঁর বেশ কিছু কিতাব পাওয়া যায়। সরকারের হস্তক্ষেপের বিরোধিতায় শায়খুল আযহার পদবি থেকে অব্যহতি নেন।

৩০. হাসুনা নওয়াউয়ি হানাফি

সময়কাল: ১৩২৪-১৩২৭ হি./ ১৯০৭-১৯০৯ খ্রি. (দ্বিতীয় দফা)

প্রায় চারজন শায়খের পর তিনি আবারও আযহারের নেতৃত্বে আসেন। তিনি প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক উভয় খাতেই আযহারের উন্নতি করেন। শুয়ুখদের বেতন বাড়িয়ে দেন। রুওয়াকে আব্বাসি নামে নতুন করে আরো একটি ক্লাসরুম বৃদ্ধি করেন। গণিত, ভূগোল, ইতিহাস সহ আধুনিক যেসব বিষয় কালের আবর্তনে হারিয়ে গিয়েছিলো, তিনি আবারও সেগুলি সংযুক্ত করেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাকতাবাগুলোকে একছাদের নিচে এনে একটি লাইব্রেরিতে রুপান্তর করেন। 

৩১. সালিম আল বাশারি মালেকি

সময়কাল: ১৩২৭-১৩৩৫ হি./ ১৯০৯-১৯১৬ খ্রি. (দ্বিতীয় দফা)

তিনজন শায়েখ গত হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো আযহারের নেতৃত্ব আসেন। মৃত্যু পর্যন্ত দায়িত্বশীল ছিলেন।

৩২. মুহাম্মদ আবুল ফদল আল জিযাওয়ি মালেকি

সময়কাল: ১৩৩৫-১৩৪৬ হি./ ১৯১৭-১৯২৭ খ্রি.

উলুমুল হাদিস, উসুলুল ফিকহ এবং তাফসির নিয়ে তাঁর চারটি গ্রন্থ বিদ্যমান আছে। তিনি আযহার সংস্করণ নামে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। তৎকালীন বাদশাহ প্রথম ফুয়াদ নিজেকে মুসলিম উম্মাহর খলিফা ঘোষণা করতে চাইলে তিনি বিরোধিতা করেন।

৩৩. মুহাম্মাদ মুস্তফা আল মারাগী হানাফি

সময়কাল: ১৩৪৬-১৩৪৭ হি./১৯২৮-১৯২৯ খ্রি. (প্রথম দফা)

তিনি শায়খ মুহাম্মদ আবদুহুর ছাত্র ছিলেন। আযহারের ইতিহাসে চতুর্থ হানাফি শায়খুল আযহার। এক ফরমান জারির মাধ্যমে সুদানে তাঁকে আদালত পরিচালনার জন্য পাঠানো হয়। মিশরে ফিরেও বিচারকার্যের গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব সামলেছেন। উলুমুল কুরআন, ফিকহ সহ মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে কলম চালিয়েছেন। এছাড়াও তাঁর বক্তব্য মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনি তোলার সামর্থ্য রাখতো। তাঁর লিখিত বারোটি গ্রন্থ পাওয়া যায়। শায়খুল আযহার হওয়ার এক বছর না পেরুতেই দায়িত্ব থেকে অবসর নেন।

৩৪. মুহাম্মদ আল আহমদি যাওয়াহেরি শাফেয়ি

সময়কাল: ১৩৪৮-১৩৫৪ হি./ ১৯২৯-১৯৩৫ খ্রি.

মানতিক সহ যুগোপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ৮টি রচনা পাওয়া যায়। তাঁর সময়ে আযহার আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রুপ নেয়। বিভিন্ন বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা ফ্যকাল্টি তৈরি করা হয়।

৩৫. মুহাম্মদ মুস্তফা আল মারাগি হানাফি

সময়কাল: ১৩৫৪-১৩৬৪ হি./ ১৯৩৫-১৯৪৫ খ্রি. (দ্বিতীয় দফা)

এর আগে বছর খানেকের জন্য শায়খুল আযহারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দ্বিতীয়বার প্রায় দশ বছর আযহারকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

৩৬. মুস্তফা আব্দুর রাজ্জাক শাফেয়ি

সময়কাল: ১৩৬৫-১৩৬৬ হি./ ১৯৪৫-১৯৪৭ খ্রি.

মিশরের সরকারী কোন মন্ত্রণালয় সামলানো সর্বপ্রথম শায়খুল আযহার তিনি। সিনিয়র উলামা কাউন্সিলের সদস্য না হয়েও আযহারের নেতৃত্ব দেয়া প্রথম ব্যক্তিত্বও তিনি। ডক্টরেট করেছেন ফ্রান্স থেকে। দর্শন এবং ফ্রেঞ্চ সাহিত্যের উপর। দর্শন, ইতিহাস, জীবনীগ্রন্থ সহ যুগোপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে অনুবাদ এবং মৌলিক গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর ১৫ টি রচনা পাওয়া যায়।

৩৭. মুহাম্মদ মামুন শান্নাউয়ি

সময়কাল: ১৩৬৮-১৩৬৯ হি./ ১৯৪৮-১৯৫০ খ্রি.

ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করতে আযহার থেকে একটি প্রতিনিধি দল তিনি ইংল্যান্ডে প্রেরণ করেন। লক্ষ্য ছিলো ইংরেজ উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামি দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পর বিদেশি ছাত্রদের জন্য আযহারে পড়াশোনা তিনিই উন্মুক্ত করে দেন। তাঁর সময়েই প্রায় দু হাজার বিদেশি আযহার থেকে ইলম হাসিল করতো। তাঁর দুটি গ্রন্থ রয়েছে।

৩৮. আব্দুল মাজিদ সালিম হানাফি

সময়কাল: ১৩৬৯-১৩৭০ হি./ ১৯৫০-১৯৫১ খ্রি. প্রথম দফা)

পঞ্চম কোন হানাফি শায়খুল আযহার। শায়খ মুহাম্মদ আবদুহুর ছাত্র ছিলেন। ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে কয়্যিম আল জাওযির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আধুনিক বিশ্বে আযহারের অবস্থান বিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

৩৯. ইব্রাহিম হামরুশ হানাফি

সময়কাল: ১৩৭০-১৩৭১ হি./ ১৯৫১-১৯৫২ খ্রি.

ষষ্ঠ কোন হানাফি শায়খুল আযহার। উচ্চপর্যায়ের আরবি সাহিত্যিক ছিলেন। একাধিক ফ্যাকাল্টির নেতৃত্ব দিয়েছেন। শায়খুল আযহার হওয়ার পর ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে আযহারের অবস্থান তুলে ধরে একটি বিবৃতি দেন। শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব হারান।

৪০. আব্দুল মাজিদ সালিম হানাফি

সময়কাল: ১৩৭১-১৩৭১ হি./ ১৯৫২-১৯৫২ খ্রি. (দ্বিতীয় দফা)

এর আগেও এক বছর আযহারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

৪১. মুহাম্মদ আল খদির হুসাইন

সময়কাল: ১৩৭১-১৩৭৩ হি./ ১৯৫২-১৯৫৪ খ্রি.

তিনি আরবি সাহিত্যের জ্ঞানকোষ ছিলেন। ভাষার বিভিন্ন সুক্ষ্ম বিষয়ে লেখালেখি করেছেন। আযহারকে নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি কায়রোস্থ এরাবিক একাডেমির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। আরবি সাহিত্য ও ইসলামি শরিয়া নিয়ে তাঁর প্রায় ১৮টি গ্রন্থ রয়েছে।

৪২. আব্দুর রহমান তাজ হানাফি

সময়কাল: ১৩৭৩-১৩৭৮ হি./ ১৯৫৪-১৯৫৮ খ্রি.

সপ্তম হানাফি শায়খুল আযহার তিনি। ডক্টরেট করেছিলেন ফ্রান্সের বিখ্যাত সোরবোন ইউনিভার্সিটি থেকে। দর্শন এবং ধর্মের ইতিহাস নিয়ে। আরবি সাহিত্য, অলংকার শাস্ত্র, উলুমুল কুরআন, কম্পেরেটিভ ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, কম্পেরেটিভ রিলিজিওন সহ আধুনিক বিভিন্ন বিষয়ে ২৯টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ইত্তেহাদ আল দুয়ালিল আরাবিয়া বা আরব জোটের মন্ত্রিত্ব পাওয়ার আগ পর্যন্ত আযহারকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

৪৩. মাহমুদ শালতুত

সময়কাল: ১৩৭৮-১৩৮৩ হি./১৯৫৮-১৯৬৩ খ্রি.

তাঁর সময়ে এসে আযহার বর্তমান রুপ লাভ করে। একটি আইন তৈরির মাধ্যমে আধুনিক ফ্যাকাল্টিগুলো আযহারের শিক্ষা সিলেবাসে মৌলিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তৈরি করা হয় মাজামাউল বুহুসিল ইসলামিয়া। এছাড়াও মহিলাদের জন্য আলাদা ইনস্টিটিউট তিনি তৈরি করেন। তিনিই সর্বপ্রথম শায়খুল আযহার, যাকে ইমামুল আকবর বা প্রধান ইমাম উপাধি দেয়া হয়। ইসলাম, আযহার, কুরআন, নারী সহ ইসলামের উপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রায় বাইশটি গ্রন্থ রচনা করেন।

৪৪. হাসান মামুন

সময়কাল: ১৩৮৩-১৩৮৯ হি./ ১৯৬৪-১৯৬৯ খ্রি.

শায়খুল আযহার হওয়ার আগেই তিনি মিসরের প্রধান মুফতি ছিলেন। জিহাদ এবং ফতোয়া বিষয়ক তাঁর দুটি গ্রন্থ রয়েছে।

৪৫. মুহাম্মদ আল ফাহহাম

সময়কাল: ১৩৮৯-১৩৯৪৩ হি./ ১৯৬৯-১৯৭৩ খ্রি.

তিনি আযহার থেকে প্যারিসে যাওয়া প্রতিনিধিদলের একজন। পরবর্তিতে সেখান থেকে গোল্ডেন রেজাল্ট করে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। আযহারের আরবি সাহিত্য বিভাগের ডীন ছিলেন। মানতিক, এডমিনিস্ট্রি ও বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে লিখেছেন। তাঁর চারটি গ্রন্থ রয়েছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব থেকে অবসর নেন।

৪৬. আব্দুল হালিম মাহমুদ মালেকি

সময়কাল: ১৩৯৩-১৩৯৭ হি./ ১৯৭৩-১৯৭৮ খ্রি.

দর্শন, সমাজবিজ্ঞান এবং বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস পড়েছেন ফ্রান্সে। এছাড়াও মিশরের বড় বড় সব শায়েখের ছাত্রত্ব লাভ করেছেন। শায়খুল আযহার হওয়ার আগে আযহার এবং রাষ্ট্রীয় একাধিক বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইসলামি বিভিন্ন শাস্ত্রের পাশাপাশি কমিউনিজম এবং দর্শন নিয়ে ১৫টি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।

৪৭. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান বাইসার

সময়কাল: ১৩৯৯-১৪০২ হি./ ১৯৭৯-১৯৮২ খ্রি.

তিনি দর্শন, আকিদা, কম্পেরেটিভ রিলিজিওন সহ যুগোপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে ৬টি গ্রন্থ রচনা করেন। ওয়াশিংটন ডিসি ইসলামিক সেন্টারের প্রধান ছিলেন। আযহারের পক্ষ থেকে লিবিয়া সফরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়াও আযহার এবং রাষ্ট্রীয় মন্ত্রিত্ব পালন সহ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বশীল ছিলেন। সবশেষে শায়খুল আযহারের মসনদ অলংকৃত করেন।

৪৮. জাদুল হক আলি জাদুল হক

সময়কাল: ১৪০২-১৪১৬ হি./ ১৯৮২-১৯৯৬ খ্রি.

তিনি মিশরের প্রধান মুফতি ছিলেন। সামলেছেন ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব। সবশেষে আযহারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন যুগোপযোগী বিষয়ে ৯টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

৪৯. মুহাম্মদ সাইয়্যেদ তনতবি শাফেয়ি

সময়কাল: ১৪১৬-১৪৩১ হি./ ১৯৯৬-২০১০ খ্রি.

আযহার থেকে হাদিস এবং তাফসিরের উপর ডক্টরেট করেছিলেন। আযহারের আসইউত শাখায় ইসলামিক থিওলজি বিভাগের ডীন ছিলেন। এছাড়া সৌদিতে মদিনা ইউনিভার্সিটির তাফসির বিভাগের প্রধান ছিলেন। শায়খুল আযহার হওয়ার আগে সামলেছেন মিশরের দারল ইফতার গুরুদায়িত্বও। মৃত্যু পর্যন্ত আযহারকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাফসির, হাদিস, আধুনিক ফিকহ সহ যুগোপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে ১৪টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁকে মদিনায় দাফন করা হয়।

৫০. আহমাদ তাইয়েব মালেকি

সময়কাল: ১৪৩১ হি./ ২০১০ খ্রিস্টাব্দ- বর্তমান।

তিনি দর্শনের উপর ডক্টরেট করেছেন। আধুনিক দর্শন, আকিদা, মানতিক সহ কঠিন সব বিষয়ে মৌলিক আর সম্পাদনা মিলিয়ে ৯টি একাডেমিক গ্রন্থের সাথে তাঁর নাম জড়িত। এছাড়াও লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ। আযহারের বড় সব পদ অলংকৃত করেছেন। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে একবছর ইসলামিক ফ্যাকাল্টির ডীন ছিলেন। ছিলেন মিশরের প্রধান মুফতিও। তিনি দানবীর, বহুমুখী চিন্তাশীল হিসেবে লোকমুখে প্রসিদ্ধ। ইসলাম এবং আযহারের মধ্যপন্থী বাণী নিয়ে সফর করছেন বিশ্বব্যাপী। আল্লাহ শায়েখের ছায়া উম্মাহর উপর দীর্ঘ করুন।